হাদীসের আলোকে শবে বরাত

হাদীসের আলোকে শবে বরাত
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকীদা বিশ্বাস হচ্ছে- কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা যে বিষয়টি প্রমাণিত নয় এবং খুলাফায়ে রাশেদা ও সাহাবাগণের আমল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয় সেটাকে দীনের অংশ মনে করা যাবে না; বরং দীনের বিধান বা ইবাদত মনে করলেও তা বিদআত হবে।
বড়ই পরিতাপের বিষয়, বর্তমানে কিছু ভাই শবে বরাত সম্পর্কে দাবী তুলছে যে, শবে বরাত কুরআন-হাদীসে নেই। এ জাতীয় ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতে শবে বরাতের ফযীলত সম্পূর্ণ অস্বীকার করছে। এমনকি এ পবিত্র রজনীতে নফল নামায পড়া, যিকির করা, দরূদ শরীফ পড়া ও কুরআন তিলাওয়াতসহ সব ইবাদত বন্দেগীকে অবৈধ ও বিদআত বলে অপপ্রচার করে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করে চলেছে।
মূলকথা: আমি পূর্বেই বলেছি, মুসলিম উম্মাহর একটি বিশেষ জামাতের দৃষ্টিতে শবে বরাত সূরা দুখানের ৩নং আয়াত দ্বারা প্রমাণিত।তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যদিও দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে তাদের এমতটি অপর মতের তূলনায় জোরালো নয়।
যদি ধরে নেয়া হয় যে, কুরআনে এনিয়ে আলোচনাই নেই। তবুও হাদীস দ্বারা তা প্রমাণিত হওয়ার ব্যাপারে খুলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবা, তাবেয়ী, সালফে সালেহীন ও চার মাযহাবের ইমামগণসহ কোনো মুফাসসির, মুহাদ্দিস ও ফকীহর দ্বিমত নেই।
আর যে আমল হাদীস, সুন্নাতে খুলাফায়ে রাশেদীন, আসারে সাহাবা ও তাবেয়ীন এবং উম্মতের ব্যাপক অবিচ্ছিন্ন আমল দ্বারা প্রমাণিত, তা অস্বীকার করে বিদআত বলা পুরো শরীয়তকে অমান্য করার শামীল ।
পক্ষান্তরে শবে বরাত সম্পর্কিত হাদীসগুলোকে জাল বলা রাসূল স.এর সম্মানের বিরুদ্ধে মারাত্মক বিদ্রোহ এবং হাদীস শাস্ত্র সম্পর্কে চরম দৃষ্টতা প্রদর্শন।
কারণ, শবে বরাত সম্পর্কে প্রায় দশজনের অধিক সাহাবী রাসূল স. থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তার মধ্যে মাত্র তিনটি হাদীস সূত্রের দিক বিবেচনায় (ضعيف) দুর্বল । এছাড়া একটি হাদীস সনদের বিচারে সহীহ। আর দুটি হাদীস (حسن لذاته) হাসান লি-জাতিহী যা সহীর অন্তর্ভুক্ত। দুটি হাদীস সহীহ লি-গায়রিহী তথা সহীহ বলেই গণ্য।
যার বিস্তারিত বিবরণ আমার লেখা বই “কুরআন হাদীসের আলোকে শবে বরাত”-এ দেখুন। এ ক্ষুদ্র পরিসরে এগুলো উল্লেখ করার সুযোগ নেই। মাত্র কয়েকটি হাদীস সামনে তুলে ধরা হবে। (ইনশাআল্লাহ)
এ হাদীসগুলো সম্পর্কে প্রসিদ্ধ হাদীস বিশারদদের মন্তব্য শুনুন:
ক. আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরীর অভিমত :
তিনি বলেন-
اعْلَمْ أَنَّهُ قَدْ وَرَدَ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ عِدَّةُ أَحَادِيثَ مَجْمُوعُهَا يَدُلُّ عَلَى أَنَّ لَهَا أَصْلًا فَمِنْهَا حَدِيثُ الْبَابِ وَهُوَ مُنْقَطِعٌ وَمِنْهَا حَدِيثُ عَائِشَةَ،ومنها حديث معاذ،ومنها حديث عبد الله بن عمرو، ومنها حديث علي (رض). فَهَذِهِ الْأَحَادِيثُ بِمَجْمُوعِهَا حُجَّةٌ عَلَى مَنْ زَعَمَ أَنَّهُ لَمْ يَثْبُتْ فِي فَضِيلَةِ لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ شَيْءٌ. (تحفة الاحوذي: ৩/৪৪২- دار الفكر)
অর্থাৎ জেনে রাখো, শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যার সমষ্টি প্রমাণ করে শরীয়তে শবে বরাতের ভিত্তি রয়েছে। এসব হাদীসের মধ্যে আলোচ্য হাদীসটি ছাড়াও রয়েছে হযরত আয়েশা রা.,হযরত মু‘আয রা.,আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. এবং হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ। এসব হাদীসের সমষ্টি ওদের বিরুদ্ধে অকাট্য দলীল হয়, যাদের ধারণা হচ্ছে শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কিত কোন হাদীস প্রমাণযোগ্য নয়। (তুহফাতুল আহওয়াযী:১/৪৪২)
উল্লেখ্য, আল্লামা মুবারকপুরী আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের প্রসিদ্ধ ইমাম ও মহামান্য ব্যক্তি। যিনি তিরমিযী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি ওই ব্যাখ্যাগ্রন্থেই এ মত উল্লেখ করেছেন। অথচ বর্তমান তথাকথিত আহলে হাদীসরা দাবী করছেন, এসব হাদীস নাকি ‘জাল’। এদেরই বিপক্ষে তাদের ইমামের উক্ত মন্তব্যটিই প্রমাণ করে যে, বর্তমান আহলে হাদীসগণ তাদের মান্যবরগণের মতের প্রতিও ইনসাফ করছেন না। এমনটা ঠিক নয়।

খ. আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী সাহেবের অভিমত-
বর্তমান যুগের লা-মাযহাবীদের সবচেয়ে বড় ইমাম ও মুহাদ্দিস আল্লামা নাসিরুদ্দিন আলবানী বলেন-
وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلا ريب والصحة تثبت بأقل منها
عددا ما دامت سالمة من الضعف الشديد كما هو الشأن في هذا الحديث، فما نقله
الشيخ القاسمي رحمه الله تعالى في ” إصلاح المساجد ” (ص ১০৭) عن أهل التعديل
والتجريح أنه ليس في فضل ليلة النصف من شعبان حديث صحيح، فليس مما ينبغي
الاعتماد عليه. (سلسلة الاحاديث الصحيحة للالباني: ৩/১৩৮)
অর্থাৎ সারকথা হচ্ছে, (শবে বরাতের ফযীলত সম্পর্কিত) হাদীসটি বহু সূত্রের সমষ্টির কারণে নিঃসন্দেহে সহীহ। কোন হাদীস অত্যাধিক দুর্বলতা থেকে নিরাপদ হলে এর চেয়ে কম সূত্রে বর্ণিত হলেও তা সহীহ প্রমাণিত হয়। আর আলোচ্য হাদীসটি অত্যাধিক দুর্বলতা থেকে মুক্ত। সুতরাং কাসেমী যে তার কিতাব ‘ইসলাহুল মাসাজিদ’এ উল্লেখ করেছেন, “শবে বরাতের ফযীলতের হাদীস সহীহ নয়” তার এ কথাটি নির্ভরযোগ্য নয়। (সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহ: ৩/১৮৩)

গ. আলবানী সাহেবের আরেকটি মন্তব্য
শবে বরাত সম্পর্কিত হাদীসের উপর আলবানী সাহেবের মন্তব্য নিম্নরূপ-
” يطلع الله تبارك وتعالى إلى خلقه ليلة النصف من شعبان، فيغفر لجميع خلقه إلا لمشرك أو مشاحن “.
قال الالباني: حديث صحيح، روي عن جماعة من الصحابة من طرق مختلفة يشد بعضها بعضا وهم معاذ ابن جبل وأبو ثعلبة الخشني وعبد الله بن عمرو وأبي موسى الأشعري وأبي هريرة وأبي بكر الصديق وعوف ابن مالك وعائشة. (سلسلة الاحاديث الصحيحة للالباني: ৩/১৩৫)
অর্থাৎ শবে বরাতের হাদীসটি (মূল বক্তব্যের দিক থেকে) ‘সহীহ’। সাহাবায়ে কিরামের একটি বড় জামাত থেকে হাদীসটি বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত।
তারা হলেন- হযরত মু‘আয রা., আবু ছা‘লাবা আল খোশানী রা., আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা., আবু মুসা আশআরী রা., আবু হুরায়রা রা., আবু বকর রা., আউফ ইবনে মালিক রা. এবং হযরত আয়েশা রা.। (দ্র: সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহ: ৩/১৩৫)
উপরোক্ত মন্তব্যগুলো ভাল করে পড়ুন, আরো বহু মুহাদ্দিসের মন্তব্য রয়েছে যারা শবে বরাতের বেশ কিছু হাদীসকে সহীহ বলেছেন। একজন মুহাদ্দিসও এমন পাওয়া যাবে না, যিনি শবে বরাতের কোন একটি হাদীসকে ‘জাল’ বা ‘মওযু’ বলেছেন। কিন্তু বড় পরিতাপের বিষয়, হাদীস শাস্ত্রের সকল আলেমদের বিপরীতে বর্তমান লা-মাযহাবী বন্ধুরা শবে বরাতের হাদীসগুলো ‘জাল’ বা ‘প্রত্যাখ্যাত’ বলে অপপ্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন। আর মুসলিম উম্মাহকে এ মহিমান্বিত রজনীর ফযীলত থেকে বঞ্চিত করছেন। এতে প্রমাণ হয়, তারা হাদীস অস্বীকারকারী।
শবে বরাত সম্পর্কীয় বহু বর্ণনা হাদীসের কিতাবে বিদ্যমান। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হাদীস নিম্নে পেশ করছি-
প্রথম হাদীস
َأَخْبَرَنَا أَبُو عَبْدِ اللهِ الْحَافِظُ، وَإِسْحَاقُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ يُوسُفَ السُّوسِيُّ، وَأَبُو بَكْرٍ الْقَاضِي، قَالُوا: حَدَّثَنَا أَبُو الْعَبَّاسِ مُحَمَّدُ بْنُ يَعْقُوبَ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ مُحَمَّدِ بْنِ عَبْدِ الصَّمَدِ الدِّمَشْقِيُّ، حَدَّثَنَا هِشَامُ بْنُ خَالِدٍ، حَدَّثَنَا أَبُو خُلَيْدٍ يَعْنِي عُتْبَةَ بْنَ حَمَّادٍ الْحَكَمِيَّ، عَنِ الْأَوْزَاعِيِّ، عَنْ مَكْحُولٍ، وَابْنِ ثَوْبَانَ يَعْنِي عَبْدَ الرَّحْمَنِ بْنَ ثَابِتِ بْنِ ثَوْبَانَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ مَكْحُولٍ، عَنْ مَالِكِ بْنِ يُخَامِرَ، عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ” يَطْلُعُ اللهُ عَلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ (المعجم الكبير: ২০/১০৮-رقم الحديث: ২১৫) (البيهقي في شعب الايمان: ৫/২৭২)
অর্থ: হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রা. রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তায়ালা শাবান মাসের পনের তারিখ রাতে সমস্ত সৃষ্টি কুলের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দান করে সকলকে ক্ষমা করে দেন। তবে মুশরিক এবং হিংসুক ছাড়া। (দেখুন: শুয়াবুল ঈমান-৫/২২৭ , আল-মু‘জামূল কাবীর-২০/১০৮)

হাদীসটি সম্পর্কে মুহাদ্দিসদের অভিমত
ক. হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী র. মুয়ায রা. এর হাদীসটি বর্ণনা করে বলেন, ইবনে হিবক্ষান হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। আর নির্ভরযোগ্যতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
খ. হাদীস পর্যালোচক আদনান আব্দুর রহমান বলেন, উক্ত হাদীসটি ইমাম বায়হাকী র. “ফাযাইলুল আওকাত” অধ্যায়ে বর্ণনা করেন। তার সনদ ‘হাসান’।
গ. (المعجم الكبير) গ্রন্থের মুহাক্কিক এবং বিশিষ্ট হাদীস পর্যালোচক বলেন, শবে বরাতের হাদীসটি বহু সূত্রে বর্ণিত। যারা সূত্রগুলো সম্পর্কে অবগত তাদের নিকট হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ পরিগণিত। (আল-মুজামূল কাবীর: ২০/১০৮)
দ্বিতীয় হাদীস
أَخْبَرَنَا أَبُو زَكَرِيَّا بْنُ أَبِي إِسْحَاقَ، أَخْبَرَنَا أَحْمَدُ بْنُ سَلْمَانَ الْفَقِيهُ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ [ص:৩৫৭] مَسْلَمَةَ، حَدَّثَنَا يَزِيدُ بْنُ هَارُونَ، أَخْبَرَنَا الْحَجَّاجُ، عَنْ يَحْيَى بْنِ أَبِي كَثِيرٍ، عَنْ عُرْوَةَ، عَنْ عَائِشَةَ، قَالَتْ: فَقَدْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ لَيْلَةٍ فَخَرَجْتُ أَطْلَبُهُ، فَإِذَا هُوَ بِالْبَقِيعِ رَافِعًا رَأْسَهُ إِلَى السَّمَاءِ، فَقَالَ: ” يَا عَائِشَةُ أَكُنْتِ تَخَافِينَ أَنْ يَحِيفَ اللهُ عَلَيْكِ وَرَسُولُهُ؟ “، قَالَتْ: قُلْتُ: وَمَا بِي مِنْ ذَلِكَ، وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ أَتَيْتَ بَعْضَ نِسَائِكَ، فَقَالَ: ” إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَغْفِرُ لِأَكْثَرَ مِنْ عَدَدِ شَعْرِ غَنَمِ كَلْبٍ ” ( سنن ابن ماجه: ص৯৯، رقم الحديث: ১৩৮৯. شعب الايمان للبيهقي: ৩/৩৮২৫)
অর্থ: হযরত আয়েশা রা. বলেন, একরাতে আমি রাসূল স.কে বিছানায় পেলাম না। তাই (খোজার উদ্দেশ্যে) বের হলাম। তখন দেখতে পেলাম,তিনি জান্নাতুল বাকীতে আছেন। আমাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, তুমি কি এ আশঙ্কা করছো যে, আল্লাহ এবং তার রাসূল তোমার প্রতি অবিচার করবেন ? আমি বললাম হে আল্লাহর রাসূল ! আমি ধারণা করছিলাম, আপনি আপনার অন্য স্ত্রীর ঘরে তাশরীফ নিয়েছেন। রাসূল স. বলেন শাবানের পনের তারিখ রাতে আল্লাহ তায়ালা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং ‘বনু কালব’ গোত্রের ভেড়ার পশমের চেয়েও অধিক সংখ্যক লোককে মাফ করে দেন। (তিরমিযী শরীফ: ১/১৫৬)
হাদীসটির ব্যাপারে মুহাদ্দিসদের অভিমত
ইবনে হিবক্ষান র. আয়েশা রা. এর হাদীসটিকে হাসান বলেছেন। (শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুনিয়্যাহ: ৭/৪৪১)
এছাড়া ইমাম ইবনে মাজা র. তার সুনানে ইবনে মাজাতে, ইবনে আবী শাইবা তার মুছান্নাফে, ইমাম আহমদ তার মুসনাদে এছাড়া আরো অনেকেই হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কেউ হাদীসটিকে জাল বা অত্যাধিক দুর্বল বলেন নি। হাদীসটির বর্ণনাকারী ছিকাহ (বিশ্বস্ত)। আর অন্য হাদীসের সহযোগিতায় হাদীসটি শক্তিশালী। এছাড়া আবু বকর রা., মু‘আজ বিন জাবাল রা. প্রমূখ প্রসিদ্ধ সাহাবী থেকে এরূপ বর্ণনা রয়েছে। সুতরাং নিঃসন্দেহে হাদীসটি হাসান এবং সহীহ লি-গাইরিহী।
তৃতীয় হাদীস
أَخْبَرَنَا أَبُو طَاهِرٍ الْفَقِيهُ، أَخْبَرَنَا أَبُو حَامِدِ بْنُ بِلَالٍ، حَدَّثَنَا مُحَمَّدُ بْنُ إِسْمَاعِيلَ الْأَحْمَسِيُ، حَدَّثَنَا الْمُحَارِبِيُّ، عَنِ الْأَحْوَصِ بْنِ حَكِيمٍ، عَنِ الْمُهَاصِرِ بْنِ حَبِيبٍ، عَنِ مَكْحُولٍ، عَنْ أَبِي ثَعْلَبَةَ الْخُشَنِيِّ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، قَالَ: ” إِذَا كَانَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ اطَّلَعَ اللهُ إِلَى خَلْقِهِ فَيَغْفِرُ لِلْمُؤْمِنِ، وَيُمْلِي لِلْكَافِرِينَ، وَيَدَعُ أَهْلَ الْحِقْدِ بِحِقْدِهِمْ حَتَّى يَدَعُوهُ ”
(شعب الايمان للبيهقي: ৩/৩৮১-رقم الحديث: ৩৮৩২)
وكذا في العجم الكبير: ২২/২২৪-رقم الحديث: ৫৯৩)
অর্থ: হযরত আবী সা‘লাবা আল খুশানী রা. থেকে বর্ণিত হুজুর স. ইরশাদ করেন, আল্লাহ তা‘আলা শা’বান মাসের পনের তারিখ রাতে স্বীয় বান্দাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেন। অতঃপর মুমিনদেরকে ক্ষমা করেন এবং কাফেরদেকে সুযোগ দেন। আর বিদ্বেষ পোষণকারীদেরকে বিদ্বেষ পরিত্যাগ করা পযর্ন্ত অবকাশ দেন। (শুয়াবুল ঈমান: ৩/৩৮১ , মু‘জামূল কাবীর: ২২/২২৩)

হাদীসের আলোকে শবে বরাতের ফযীলত
(ক) এ রাতে জীবন-মৃত্যু ও বার্ষিক বাজেট চুড়ান্ত হয়-
قوله (وَعَنْ عَائِشَةَ، أَنَّ النَّبِيَّ) : وَفِي نُسْخَةٍ صَحِيحَةٍ مَنْسُوبَةٍ إِلَى الْعَفِيفِ: عَنِ النَّبِيِّ (صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” قَالَ هَلْ تَدْرِينَ) ، أَيْ: تَعْلَمِينَ (مَا) ، أَيْ: مَا يَقَعُ (فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ) ، أَيْ: مِنَ الْعَظَمَةِ وَالْقُدْرَةِ وَتَقْدِيرِ الْأَمْرِ، وَقَوْلُ ابْنِ حَجَرٍ: نَبَّهَ – عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ ৃ..لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ) : وَالظَّاهِرُ أَنَّ قَائِلَ يَعْنِي عَائِشَةَ (قَالَتْ) : نَقَلَ بِالْمَعْنَى، وَإِلَّا فَالظَّاهِرُ قُلْتُ: (مَا فِيهَا) ، أَيْ: مَا يَقَعُ فِيهَا (يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ فَقَالَ: ” فِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كُلُّ مَوْلُودٍ مِنْ بَنِي آدَمَ) : وَتَخْصِيصُهُمْ تَشْرِيفٌ لَهُمْ (فِي هَذِهِ السَّنَةِ) ، أَيْ: الْآتِيَةِ إِلَى مِثْلِ هَذِهِ اللَّيْلَةِ (وَفِيهَا أَنْ يُكْتَبَ كُلُّ هَالِكٍ) ، أَيْ: مَيِّتٌ (مِنْ بَنِي آدَمَ فِي هَذِهِ السَّنَةِ) : قَالَ الطِّيبِيُّ: هُوَ مِنْ قَوْلِهِ تَعَالَى: {فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ} [الدخان: ৪] مِنْ أَرْزَاقِ الْعِبَادِ وَآجَالِهِمْ، وَجَمِيعِ أُمُورِهِمْ إِلَى الْأُخْرَى الْقَابِلَةِ (وَفِيهَا تُرْفَعُ أَعْمَالُهُمْ)،ৃৃৃ. (مشكاة المصابيح مع شرحه: ৪/৬৭১-رقم الحديث: ১৩১৩) المطبعة الهندية: ১/৪০৮)
অর্থ: আয়শা রা. রাসূল স. থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন- তুমি কি জান এ রাতে কি কাজ করা হয় ? অর্থাৎ শা’বানের মধ্য রাতে। (আয়েশা রা. বলেন আমি বললাম) কি কাজ করা হয় হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, এ রাতে পুরো বছর যতগুলো সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়। আর এ রাতে পুরো বছর কত লোক ইন্তেকাল করবে তা লেখা হয়। আর এ রাতেই বান্দাদের (পুরো বছরের) কার্যাবলী (আসমানে) উঠানো হয়। আর এ রাতেই নির্ধারিত রিযিক অবতীর্ণ হয়। তারপর আয়েশা রা. জানতে চাইলেন যে, আল্লাহর রহমত ব্যতীত কেউ কি জান্নাতে যেতে পারবে ? হুজুর স. তিনবার বললেন কখনো না। আয়েশা রা. জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল ! আপনিও না ? তখন রাসূল স. নিজের মাথায় হাত রেখে বললেন, আমিও না। তবে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত আমাকে ঢেকে রেখেছে। একথাটি তিনি তিনবার বললেন। (মিশকাত :১/৪০৮)
(খ) সূর্যাস্ত থেকে সকাল পর্যন্ত পুরষ্কার বিতরণের ঘোষণা-
حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْخَلَّالُ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ قَالَ: أَنْبَأَنَا ابْنُ أَبِي سَبْرَةَ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِي فَأَغْفِرَ لَهُ أَلَا مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا، حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ ” (سنن ابن ماجه: ১/১৪৪- رقم الحديث: ১৩৮৮، وكذا في شعب الايمان: ৩/৩৭৮)
অর্থ: হযরত আলী রা. থেকে বর্ণিত হুজুর স. বলেন, যখন শা’বানের পঞ্চদশ রাতের আগমন হয় তখন তোমরা সারা রাত নামাজ পড় এবং দিনে রোজা রাখ। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের সময় আল্লাহ তা‘আলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং সুবহে সাদিক পর্যন্ত এই আহবান করতে থাকেন। আছে কি কোন ক্ষমাপ্রার্থী, আমি তাকে ক্ষমা করে দিব। আছে কি কোন রিযিক যাচনাকারী, আমি তাকে রিযিক দিব। আছে কি কোন বিপদগ্রস্থ, আমি তাকে বিপদ হতে পরিত্রাণ দিব। আছে কি এমন কেউ ? আছে কি এমন কেউ ?
(গ) শবে বরাতে জাগরণ করলে জান্নাতের সু-সংবাদ
وروي عن معاذ بن جبل رضي الله عنه قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من أحيا الليالي الخمس وجبت له الجنة ليلة التروية وليلة عرفة وليلة النحر وليلة الفطر وليلة النصف من شعبان (الترغيب والترهيب: ২/১৫২-رقم الحديث: ১৬৫৯)
“হযরত মু‘আয রা. বর্ণনা করেন,রাসূল স. ইরশাদ করেন- যে ব্যক্তি পাঁচ রাত ইবাদত বন্দেগীতে কাটাবে তার জন্য জান্নাত অবধারিত। ১. জিলহজ্জের আট তারিখের রাত। ২. আরাফার রাত। ৩. ঈদুল আযহার রাত। ৪. ঈদুল ফিতরের রাত। ৫. শাবানের মধ্য রাত অর্থাৎ শবে বরাত। (আত-তারগীব ওয়াত তারহীব: ২/১৫২)

ইসলাম, জাতি ও মানবতার কল্যাণে