কুরআনের আলোকে শবে বরাত

কুরআনের আলোকে শবে বরাত
পবিত্র কুরআনে সূরায়ে দুখানের তিন নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন- إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةٍ مُبارَكَةٍ  অর্থাৎ “একটি মুবারক রাতে আমি কুরআন নাযিল করেছি” এরপর এ সুরার ৪নং আয়াতে ইরশাদ করেন: فِيها يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
অর্থাৎ এই রাতেই প্রত্যেক জ্ঞানপূর্ণ বিষয় স্থীর হয় (মানুষের ভাগ্য তালিকা বণ্টন হয়)।
অন্য দিকে ভাগ্য তালিকা বণ্টনের রাতকে রাসুল স. এর হাদীসে শা’বানের মধ্য রাত তথা পনেরো তারিখের রাত বলা হয়েছে। এদুটি কথার মর্ম দাঁড়ায়, শাবানের পনের তারিখের রাত যাকে শবে বরাত বলা হয়। এ রাতেই কুরআন নাযিল করা হয়েছে । অপর দিকে সূরা ক্বদরে পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছে যে, (إِنَّا أَنْزَلْناهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْر) “পবিত্র কুরআন লাইলাতুল ক্বদরেই নাযিল করা হয়েছে”। যে রাতটি পবিত্র রমযান মাসেরই অর্ন্তগত। যেমন সূরা বাকারার ১৮৫ নং আয়াতে উল্লেখ আছে-
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنْزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ ..الخ. 
সুতরাং এখানে দুটি বিষয় লক্ষণীয়। একটি হলো, কুরআন নাযিল হওয়ার রাত। আরেকটি হলো, মানুষের ভাগ্য লিপি চুড়ান্তের রাত। এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হলো, সূরা দুখানে (ليلة مباركة) “বরকতপূর্ণ রাত” বলা হয়েছে। কিন্তু শবে কদর বা শবে বরাত কিছুই উল্লেখ করা হয়নি। তাই লাইলাতুল মুবারাকা/বরকতপূর্ণ রাত বলতে কোন রাতকে বুঝানো হয়েছে। এনিয়ে তাফসীর বিশারদদের মধ্যে বিভিন্ন মত দেখা দিয়েছে।
প্রথম মত: অধিকাংশ মুফাস্সিরদের মত হলো, লাইলাতুল মুবারাকা থেকে উদ্দেশ্য ‘শবে ক্বদর’ যা রমযান মাসের অর্ন্তগত। কেননা, সূরা দুখানের ৩ নং আয়াতের প্রথমে বলা হয়েছে, “আমি পবিত্র কুরআন নাযিল করেছি মুবারক রাতে।” আর এটা সর্বস্বীকৃত যে, কুরআন শবে ক্বদরেই অবতীর্ণ হয়েছে।
দ্বিতীয় মত: হযরত ইকরামা ও কাতাদাহ র.-এর মতো শীর্ষ তাবেয়ীদের মত হচ্ছে-
লাইলাতুল মুবারকা থেকে উদ্দেশ্য, শবে বরাত। কেননা, পরের আয়াতে (৪নং আয়াত) বলা হয়েছে, উক্ত রাতে মানুষের ভাগ্যলিপি চুড়ান্ত হয়।আর সব হাদীসে স্পষ্টভাবে এসেছে, ভাগ্য তালিকা বণ্টন শবে বরাত তথা শাবানের মধ্য রাতেই হয়। আর ৩নং আয়াতে কুরআন নাযিল হওয়ার মর্ম হলো, সকল প্রজ্ঞাময় বিষয়ের মধ্যে কুরআন অবতীর্ণ সবার শীর্ষে। তাই ভাগ্য তালিকা বণ্টনের রাতে কুরআন অবতীর্ণ করার সিদ্ধান্তও আল্লাহ নিয়েছেন। সে অনুপাতে কুরআন লাইলাতুল ক্বদরে অবতীর্ণ হয়েছে। সুতরাং এখানে নাযিলের সিদ্ধান্তকে নাযিল করেছি বলা হয়েছে।
আল্লামা ফখরুদ্দীন রাযী র. তার প্রসিদ্ধ তাফসীর গ্রন্থ ‘আত-তাফসীরুল কাবীরে’ লিখেন-

اخْتَلَفُوا فِي هَذِهِ اللَّيْلَةِ الْمُبَارَكَةِ، فَقَالَ الْأَكْثَرُونَ: إِنَّهَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ، وَقَالَ عِكْرِمَةُ وَطَائِفَةٌ آخَرُونَ: إِنَّهَا لَيْلَةُ الْبَرَاءَةِ، وَهِيَ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ: 14/338، مفاتيح الغيب: 27/303) 

অর্থ: এ বরকতময় রাতের ব্যাপারে সাহাবাদের মাঝে মতভেদ রয়েছে। অধিকাংশের মতে এটা লাইলাতুল কদর। আর হযরত ইকরিমা র.সহ অন্য একদল আলেমের মতে এ রাতটি হলো শবে বরাত। অর্থাৎ শাবানের মধ্য রাত। (আত-তাফসীরুল কাবীর -১৪/৩৩৮)
ইমাম রাযী র. এ মতের পক্ষে দলীল পেশ করার পর বলেন-

أَنَّ لَيْلَةَ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ لَهَا أَرْبَعَةُ أَسْمَاءَ: اللَّيْلَةُ الْمُبَارَكَةُ، وَلَيْلَةُ الْبَرَاءَةِ، وَلَيْلَةُ الصَّكِّ ، وَلَيْلَةُ القدر.(الجامع لاحكام القرآن: ১৬/১২৬)

অর্থ: (অতপর) যারা এ আয়াতে ليلة مباركة এর অর্থ ‘শবে বরাত’ করেছেন তাদের দৃষ্টিতে শা’বানের মধ্যরাত্রির চারটি প্রসিদ্ধ নাম রয়েছে। যথা: আল লাইলাতুল মুবারকাহ, লাইলাতুল বরাত, লাইলাতুস্সক এবং লাইলাতুল কদর। (তাফসীরে কাবীর: ১৪/৩৩৯)
সারকথা- ‘শবে বরাত’ কুরআন দ্বারা প্রমাণিত কিনা ? এর জবাব উপরোক্ত আলোচনা থেকেই বুঝে যায়। অধিকাংশ মুফাসসিরদের মতে সূরা দুখানে শবে বরাতের আলোচনা নেই। সূরা দুখানের ৩নং আয়াতে বরকতপূর্ণ রাত (ليلة مباركة) বলতে শবে বরাত উদ্দেশ্য নয়; বরং শবে ক্বদরই উদ্দেশ্য। তারা বলেন , শবে বরাত বহু হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। বিধায় শবে বরাত অস্বীকারকারী পথভ্রষ্ট।
আর হযরত ইকরিমা, কাতাদাহ এবং তাদের অনুসারী কিছু সংখ্যক মুফাসসির বলেন, শবে বরাত স্বয়ং কুরআনের সূরা দুখানের ৩নং আয়াত দ্বারাই প্রমাণিত। এর অস্বীকার কুরআনের আয়াতের সরাসরি অস্বীকারের শামিল। (দ্র. তাফসীর খ.১৪ পৃ.৩৪১)
আমাদের দৃষ্টিতে এ দু’মতের মধ্যে প্রথমটি অগ্রগণ্য। এ ব্যাপারে বিশদ ব্যাখ্যাসহ জানতে লিখকের বই ‘কুরআান হাদীসের আলোকে শবে বরাত পড়তে পারেন।
এখানে বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যারা প্রথম মতটি গ্রহণ করেছেন যে, মুবারক রাত থেকে উদ্দেশ্য শবে ক্বদর। তারা কেউই কিন্তু শবে বরাতকে অমান্য বা বিদআত বলেননি। বরং তারা সবাই শবে বরাত হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং বড়ই গুরুত্বপূর্ন রাত বলে মত ব্যক্ত করেছেন। শবে বরাতের ফযীলত অর্জনের লক্ষে তা পালনও করতেন।
কিন্তু আজ যারা এদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে কুরআনের উক্ত আয়াতে শবে বরাতের আলোচনা নেই বলছেন। তারা অনেকে শবে বরাত কে ভিত্তিহীন, জাল হাদীস দ্বারা প্রমাণিত, অগ্রহণযোগ্য, বিদআত বলছেন। অথচ তাদের তাফসীরের অনুকরণে কুরআনে শবে বরাত অবশ্য মান্য করার কথা ছিলো। কিন্তু তারা তা না করে কুরআনে না থাকার অজুহাত দেখিয়ে ১২টির মতো সহীহ, হাসান আমলযোগ্য হাদীস কে অস্বীকার করছেন। এটা মোটেও কাম্য নয়। আল্লাহ পাক সকলকে সঠিক বুঝ দান করুন। আমীন ॥

ইসলাম, জাতি ও মানবতার কল্যাণে